চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিস্ময় আল-কানুন
ইবনে সিনা
* চিকিৎসাবিজ্ঞানের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব মুসলিম পলিম্যাথ ইবনে সিনা পশ্চিমে আভিসিনা নামেই বেশি পরিচিত। বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় তার অবদান থাকলেও চিকিৎসাবিষয়ক বিশ^কোষ ‘আল-কানুন ফিত-তিব্ব’ বা ‘ক্যানন অব মেডিসিন’ তাকে অমরত্ব দিয়েছে। এ গ্রন্থে তিনি তৎকালীন সময়ের পরিচিত সব রোগ ও তার চিকিৎসার বিবরণ তুলে ধরে বিশ^কে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। পূর্ববর্তী গ্রিক-রোমান চিকিৎসা পদ্ধতি, পারসিক চিকিৎসা পদ্ধতি এবং ভারতীয় চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কেও তিনি আলোচনা করেন।
* ১০২৫ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত এ গ্রন্থ আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের সফলতার পেছনে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে। ১১৫০ সালে ‘ক্যানন মেডিসিনায়ে’ নামে এটি ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হয় এবং ইউরোপের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসা বিজ্ঞানের পাঠ্যপুস্তক হিসেবে সিলেবাসভুক্ত হয়। তখন থেকে সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত পুরো ৫০০ বছরজুড়ে আল-কানুন ইউরোপের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা অনুষদে আধিপত্য ধরে রেখেছে এবং বিশ^সেরা চিকিৎসক তৈরি করেছে।
* আল-কানুন মোট পাঁচ খ-ে বিভক্ত। প্রথম খ-ে মানুষের শরীরের বহির্ভাগ ও অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন অঙ্গপ্রতঙ্গের বিবরণ এবং তাদের কাজসমূহ বর্ণনা করা হয়েছে। পাশাপাশি শারীরিক সুস্থতা বজায় রাখার জন্য সাধারণ স্বাস্থ্যবিধিও আলোচিত হয়েছে। দ্বিতীয় খ-ে বিভিন্ন চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। তৃতীয় ও চতুর্থ খ-ে বিভিন্ন রোগ ও তার চিকিৎসা সম্পর্কে আলোচনা এবং পঞ্চম খ-ে ওষুধ তৈরির প্রক্রিয়া আলোচিত হয়েছে।
* কিডনি ও মূত্রাশয়ের বিভিন্ন রোগ ও তার চিকিৎসা সম্পর্কে সর্বপ্রথম ইবনে সিনাই এ গ্রন্থে ধারণা দেন। এছাড়া প্রস্রাবের সঙ্গে ব্লিডিং হওয়ার কারণও তিনিই প্রথম উদ্ঘাটন করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, অসুস্থতার কারণ ও সুস্থ হওয়ার পন্থা উভয় শনাক্ত করা ছাড়া রোগী কখনোই সুস্থ হতে পারে না। আল-কানুনে তিনি বলেন, ‘চিকিৎসাশাস্ত্র এমন এক বিজ্ঞান, যার মাধ্যমে আমরা শরীরের বিভিন্ন অবস্থার কথা জানতে পারি। জানতে পারি সুস্থতা, অসুস্থতা, স্বাস্থ্যহানীর কারণ এবং তা কখন ঘটে।’
* মানবদেহের উপাদান সম্পর্কে ধারণা দিয়ে তিনি বলেন, ‘মানবদেহ চার ধরনের উপাদান দিয়ে গঠিত। উষ্ণ উপাদান, শীতল উপাদান, শুষ্ক উপাদান এবং আর্দ্র উপাদান।’ মানবজীবনের ধাপগুলো বিন্যাসেও তার দেওয়া তত্ত্ব সর্বজনবিদিত। তিনি মানব জীবনকে চারটি ধাপে এবং প্রথম ধাপকে আবার পাঁচ ধাপে ভাগ করেন। মানবজীবনের এই চারটি ধাপ হলো; ত্রিশ বছর বয়স পর্যন্ত যৌবন, ৪০ বছর বয়স পর্যন্ত মধ্যবয়স, ৬০ বছর পর্যন্ত পড়ন্তবেলা এবং এরপর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বার্ধক্য। যৌবনের পাঁচটি ভাগ হলো নবজাতক, শিশু, বালক/বালিকা, কিশোর/কিশোরী এবং তরুণ/তরুণী।
* আল-কানুন গ্রন্থের মাধ্যমেই তিনি মানবস্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সংক্রান্ত যাবতীয় জ্ঞানকে একত্রিত করার প্রচেষ্টা গ্রহণ করেন। এই গ্রন্থের মাধ্যমেই চিকিৎসা সংক্রান্ত বিশ্বকোষ রচনার সূচনা হয়। এ ছাড়াও চিকিৎসা বিজ্ঞানে তিনি আরও ৪০টি গ্রন্থ রচনা করেন। বহুশাস্ত্রে পারদর্শী ইবনে সিনার রচিত মোট গ্রন্থ সংখ্যা ৪৫০।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন